
শরীফ খান.
গতকাল রাতের ঘটনা। দক্ষিণ কোরিয়ায় ভার্সিটি থেকে আসার সময় আমার ওয়ালেটটি হারিয়ে ফেলেছিলাম। ওয়ালেটের ভেতরে ছিল প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র, পরিচয়পত্র, কোরিয়ান কারেন্সি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র। হারানোর পর স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, হয়তো আর ফিরে পাব না, কারন আমি ক্লিয়ার ছিলাম না এক্সাক্ট কোথায় হারিয়েছি। তারপর স্থানীয় থানায় জানিয়ে চলে আসি।
কিন্তু আজকের অভিজ্ঞতা আমার সেই ধারণাকে বদলে দিল।
কোরিয়ান পুলিশ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমার হারানো ওয়ালেটটি খুঁজে বের করে আমার হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে। শুধু ওয়ালেটটি ফেরত দেওয়াই নয়, তাদের আচরণ, দায়িত্বশীলতা এবং নাগরিকের প্রতি আন্তরিকতা আমাকে গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। একজন বিদেশি নাগরিক হিসেবে আমি তাদের কাছে বিশেষ কোনো সুবিধা আশা করিনি। কিন্তু তারা আমাকে একজন নাগরিকের মতোই গুরুত্ব দিয়েছে, সম্মান দিয়েছে এবং আমার হারানো সম্পদ ফিরে পাওয়ার প্রক্রিয়ায় আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছে।
ওয়ালেটটি ফিরে পাওয়ার আনন্দের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে একটি উপলব্ধি। আইন তখনই সুন্দর, যখন তার প্রয়োগ মানুষের জীবনে নিরাপত্তা ও আস্থা তৈরি করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সমাজব্যবস্থা ও আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে একটি বিষয় বিশেষভাবে চোখে পড়ে। এখানে নাগরিক সেবা শুধু সরকারি দপ্তরের একটি আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার আস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু। একজন মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন সে যদি মনে করে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তার পাশে দাঁড়াবে, তখন রাষ্ট্রের প্রতি তার আস্থা আরও শক্তিশালী হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশের বাস্তবতা আমাদের অনেকেরই জানা। বাংলাদেশে কেউ তার মূল্যবান জিনিস হারালে সেটি ফিরে পাওয়া অনেক সময় অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে থানায় গিয়ে নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়, আবার কখনো কখনো হারানো জিনিস ফিরে পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিতে হয়। এমনও অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিককে কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে হয়রানি বা অতিরিক্ত ব্যয়ের মুখোমুখি হতে হয়।
তবে বাংলাদেশের পুলিশকে আমি ছোট করতে চাই না। কারণ বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যদের মধ্যেও অসংখ্য সৎ, দায়িত্বশীল ও মানবিক কর্মকর্তা রয়েছেন, যারা প্রতিদিন সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও মানুষের সেবা করে যাচ্ছেন। কিন্তু একজন নাগরিক হিসেবে আমাদের প্রত্যাশা আরও বেশি। আমরা চাই, ভালো কাজগুলো যেন ব্যতিক্রম না হয়ে নিয়মে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের আইনও কম সুন্দর নয়। আমাদের দেশে হারানো সম্পদ উদ্ধার, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু আইনের সৌন্দর্য কেবল কাগজে থাকলে হয় না, তার সৌন্দর্য প্রকাশ পায় প্রয়োগে।
আমার আজকের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হতে পারে। থানায় গিয়ে একজন মানুষ যেন ভয় না পান, বরং নিরাপত্তা অনুভব করেন। হারানো কোনো জিনিসের অভিযোগ করতে গিয়ে যেন মনে না হয়, তিনি নিজের অধিকার চাইতে কোনো অনুগ্রহ প্রার্থনা করছেন। পুলিশ যেন শুধু অপরাধী ধরার প্রতিষ্ঠান না হয়ে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একজন নির্ভরযোগ্য সহায়ক হয়ে ওঠে।
প্রযুক্তির এই যুগে বাংলাদেশেও হারানো জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধারের জন্য আরও কার্যকর ডিজিটাল ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। প্রতিটি থানায় নাগরিক সেবাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করা গেলে সাধারণ মানুষের আস্থা অনেক বাড়বে।
দক্ষিণ কোরিয়ার পুলিশের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষ করে একজন বিদেশি নাগরিকের হারানো ওয়ালেট খুঁজে বের করে যে আন্তরিকতা ও সৌজন্যের সঙ্গে তারা সেটি ফিরিয়ে দিয়েছেন, তা আমার কাছে শুধু একটি ব্যক্তিগত উপকার নয়, বরং একটি দেশের নাগরিক সেবা ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধা তৈরি করার মতো একটি অভিজ্ঞতা।
আজ আমার ওয়ালেট ফিরে এসেছে। কিন্তু এর সঙ্গে ফিরে এসেছে আরও একটি মূল্যবান জিনিস, আইনের প্রতি আস্থা।
বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যদের প্রতি তাই আমার বিনীত আহ্বান, আইনকে শুধু প্রয়োগের ক্ষমতা হিসেবে নয়, মানুষের অধিকার রক্ষার দায়িত্ব হিসেবেও দেখুন। আর রাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান, পুলিশ ও নাগরিক সেবাকে আরও আধুনিক, মানবিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক করে তুলুন।
কারণ একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত সৌন্দর্য শুধু তার উন্নত ভবন, প্রশস্ত রাস্তা কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে নয়।
একজন সাধারণ মানুষ বিপদে পড়ে রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়ার পর, রাষ্ট্র তার সঙ্গে কেমন আচরণ করে, সেখানেই একটি রাষ্ট্রের মানবিকতার প্রকৃত পরিচয়।
কোরিয়ান পুলিশকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আর বাংলাদেশের জন্য রইল একটি প্রত্যাশা, একদিন আমাদের দেশেও একজন সাধারণ নাগরিক যেন একই আস্থা নিয়ে বলতে পারেন, “আমি বিপদে পড়লে আমার রাষ্ট্র আমার পাশে দাঁড়াবে।”