তৌহিদ হোসেন সরকার. কৃষক-শ্রমিকের অধিকার না দিয়ে সরকার কার্ডের খেলা খেলছে,
প্রকৃতপক্ষে মেহনতি মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হচ্ছে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, শ্রমজীবী মানুষের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত এবং বৈষম্যহীন সমাজ গড়তে ইসলামী শ্রমনীতির বাস্তবায়ন অনিবার্য। এ জন্য শ্রমিক সংগঠনে গুণগত পরিবর্তন, দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের পৃথক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
নেত্রকোনা জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত ট্রেড ইউনিয়ন প্রতিনিধি সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন জেলা সভাপতি মো. কামাল উদ্দিন। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লসকর মো. তসলিম, জেলা প্রধান উপদেষ্টা মাওলানা ছাদেক আহমাদ হারিছ, উপদেষ্টা মাওলানা মাহবুবুর রহমান এবং নেত্রকোনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা শাখার উপদেষ্টা মাছুম মোস্তফা।
নেত্রকোনার সমাবেশে আতিকুর রহমান বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও কৃষক উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না, শ্রমিক বঞ্চিত হচ্ছেন ন্যায্য মজুরি থেকে। অথচ কৃষক-শ্রমিকের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই দেশের অর্থনীতি সচল রয়েছে। তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন না হলে রাষ্ট্রের প্রকৃত পরিবর্তন সম্ভব নয়।
কৃষকদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, নেত্রকোনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকেরা দিনরাত পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করলেও মধ্যস্বত্বভোগী ও সিন্ডিকেটের কারণে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কৃষক কম দামে ধান বিক্রি করছেন, অথচ ভোক্তাকে চড়া দামে চাল কিনতে হচ্ছে। এই বৈপরীত্যের অবসানে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
পোশাকশ্রমিকদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পোশাকশ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। কিন্তু তাদের ন্যূনতম মজুরি ও জীবনমান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সরকার নির্ধারিত সাড়ে ১২ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরিও প্রায় ৪০ শতাংশ কারখানায় যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। শ্রমিকের ঘামে মালিকের মুনাফা বাড়লেও শ্রমিকের সংসারে স্বস্তি না ফেরার পরিস্থিতি চলতে পারে না।
পরিবহন শ্রমিকদের কর্মপরিবেশের বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আতিকুর রহমান বলেন, পর্যাপ্ত চালকের অভাবে দূরপাল্লার রুটে একজন চালককে টানা ১৫ থেকে ২১ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালাতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। দুর্ঘটনার দায় নির্ধারণে মালিক, চালক ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়, প্রয়োজন নীতির পরিবর্তন। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য এবং শ্রমজীবী মানুষের মর্যাদা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
অন্যদিকে, একই দিন কিশোরগঞ্জ শহরের নগুয়ায় আল-ফারুক ট্রাস্ট মিলনায়তনে ফেডারেশনের কিশোরগঞ্জ জেলা শাখার দায়িত্বশীল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। জেলা সভাপতি খালেদ হাসান জুম্মনের সভাপতিত্বে আয়োজিত এ সমাবেশের প্রতিপাদ্য ছিল, ‘শ্রমজীবী মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায়, ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়ন অনিবার্য’।
এ সমাবেশে আতিকুর রহমান বলেন, দেশের অর্থনীতি ও উন্নয়নে শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম হলেও তারা ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে স্বল্প আয়ের শ্রমিকদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার অভাব ও বৈষম্য তাদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে তুলছে।
তিনি বলেন, শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে ব্যক্তিগত ও দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিলে প্রকৃত শ্রমিক আন্দোলন সফল হবে না। নামমাত্র আশ্বাস কিংবা লোকদেখানো আন্দোলনের পরিবর্তে শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করতে কার্যকর কর্মপরিকল্পনা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্ব প্রয়োজন।
শ্রমিক সংগঠনকে তৃণমূল পর্যায়ে শক্তিশালী করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সব পেশার শ্রমিককে সংগঠিত করতে হবে। প্রতিটি কারখানা, কর্মক্ষেত্র, টার্মিনাল, বন্দর ও বাজারে পেশাভিত্তিক কমিটি গঠনের মাধ্যমে শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ শক্তিতে পরিণত করতে হবে। সঠিক নেতৃত্ব ও সুসংগঠিত আন্দোলন ছাড়া শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী শ্রমনীতির আলোকে ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন শ্রমব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও কল্যাণে সংগঠনের কার্যক্রম আরও জোরদার করে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সব শ্রেণি-পেশার শ্রমিককে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।
কিশোরগঞ্জের সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লসকর মো. তসলিম ও জেলা প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক রমজান আলী। এতে জেলা ও বিভিন্ন উপজেলার পেশাভিত্তিক শ্রমিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।