দেলোয়ার হোসেন রশিদি.চট্টগ্রাম ।
সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যার প্রভাব এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলা। বন্যার পানিতে কৃষকদের বিস্তীর্ণ সবজির ক্ষেত তলিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে দেখা দিয়েছে সরবরাহ সংকট। এর প্রভাবে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ।
গেল জুমাবার বিকালে (২৪জুলাই) উপজেলার আমিরাবাদ বটতলি কাঁচা বাজারে সরজমিনে দেখা যায়, প্রতি কেজি ঝিঙ্গা বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা, বেগুন ১২০ টাকা, চিচিঙ্গা ৮০ থেকে ১০০ টাকা, শসা ১৩০ টাকা, কাকরোল ৮০ টাকা এবং কাঁচামরিচ প্রায় ২০০ টাকা দরে। অথচ বন্যার আগে এসব সবজি ৩০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যেই পাওয়া যেত। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে অনেক সবজির দাম দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
গত ৭ জুলাই টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। টানা কয়েক দিন পানির নিচে ছিল উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা। এতে ৫০ হাজারের বেশি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়ে। বন্যায় কৃষিজমি, সবজির ক্ষেত, মাছের খামার ও গ্রামীণ সড়কের ব্যাপক ক্ষতি হয়।
তথ্য অনুসন্ধান মতে লোহাগাড়া উপজেলার কৃষি অফিসার কাজী সফিউল ইসলাম জানান, এবারে টানা বর্ষনে বন্যায় লোহাগাড়ার ৯ ইউনিয়নে কৃষকদের চাষাবাদে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গ্রীষ্মকালীন সবজি : ১৫০ হেক্টর জমি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক : ৩৫০০ জন প্রায়, ক্ষতির পরিমাণ: ২১৮৬৪০০০/-হেক্টর প্রায়।
আউশধান : ১৪৫ হেক্টর, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক: ১০০০ জন (প্রায়), ক্ষতির পরিমাণ :১৯৪৮৮০০০/- (প্রায়)।
আমনধান বীজতলা : ২১৫ হেক্টর, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক : ৪৮০০ জন (প্রায়), ক্ষতির পরিমাণ : ৯৬৭৫০০০/- (প্রায়)।
পান : ৫ হেক্টর, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক : ১০০ জন (প্রায়), ক্ষতির পরিমাণ : ৩৮৩৫০০/- (প্রায়)। একারণে স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় বর্তমানে লোহাগাড়া উপজেলাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামে ফটিকছড়ি, ফেনী ও চট্টগ্রাম থেকে সবজি এনে বাজারের চাহিদা মেটাতে হচ্ছে।
কৃষক নাছির উদ্দীন বলেন, বন্যার পানিতে আমার সবজির ক্ষেত পুরোপুরি তলিয়ে যায়। কয়েক দিন পানির নিচে থাকায় সব চারা নষ্ট হয়ে গেছে। এখন নতুন করে আবাদ করতে সময়ের পাশাপাশি পুঁজিরও সংকট রয়েছে।
বাজারে সবজি কিনতে আসা রশিদেরঘোনা আশরাফ কাজী জামে মসজিদের খতিব মাওলানা শোয়াইব বলেন, বন্যার আগে যে সবজি ৩০ থেকে ৪০ টাকায় কিনতাম, এখন একই সবজির জন্য ৮০ থেকে ১২০ টাকা গুনতে হচ্ছে। আয় কমেছে, কিন্তু সংসারের খরচ বেড়েই চলেছে।
আরেক ক্রেতা সেলিম দর্জি বলেন, নিত্যপণ্যের পাশাপাশি সবজির দামও যেভাবে বেড়েছে, তাতে পরিবার নিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সবজি বিক্রেতা লিটন বলেন, আগে স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকেই বেশির ভাগ সবজি সংগ্রহ করতাম। কিন্তু বন্যায় উৎপাদন নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন ফটিকছড়ি, ফেনী ও চট্টগ্রাম থেকে সবজি আনতে হচ্ছে। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বিক্রিমূল্যও বাড়াতে হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাজী সফিউল আলম বলেন, বন্যায় উপজেলার বিভিন্ন এলাকার সবজির ক্ষেত ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছে, যার কারণে সবজির দাম বেড়েছে। কৃষকদের পুনর্বাসন এবং দ্রুত উৎপাদনে ফিরিয়ে আনতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নতুন মৌসুমের সবজি বাজারে এলে দাম ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হবে বলে আশা করছি।
স্থানীয়দের দাবি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত প্রণোদনা, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং প্রয়োজনীয় কৃষি উপকরণ সরবরাহের পাশাপাশি বাজারে নিয়মিত তদারকি জোরদার করা হলে কৃষকরা দ্রুত উৎপাদনে ফিরতে পারবেন। একই সঙ্গে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হলে সাধারণ ভোক্তারাও মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে কিছুটা স্বস্তি পাবেন।